রাতের অন্ধকার এখনো যায়নি , ভোরের আলোর আভাফুটচ্ছে সবে সাইকেলের ঘন্টা বাজাতে বাজাতে শুভ চললো সকালের তাজা সংবাদ প্রতি বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে । এটা তার রোজকেরে কাজ তা নাহলে তার পেট চুপ থাকবে না । বাড়িতে তার 'মা' আছে , মা বাড়ি বাড়ি কাজ করে বেড়ায় সে পয়সায় তাদের সংসার ঠিক ঠাক চলে না । তাই সে নিজের পড়ার খরচ টা এই পেপার বিক্রির মাধ্যমেই চালিয়ে নেয় , বাকি টা সে বাড়িতে দিয়ে দেয় । বাবা কে ছোটো বেলা থেকেই দেখেনি । এত কিছুর করার পর সে কিন্তু কোনো দিনও পড়তে দেরিতে আসেনি আর স্কুল টা ছিলো তার কাছে শিক্ষার ভান্ডার ।যে ছাত্রটি তাড়াহুড়ো করে নিজের খরচায় নিজের জেদে নিজের খরচায় , ঘরের সব কাজ সামলে পড়তে আসে, সে সেখার জেদ নিয়ে অনেকদূর যাবে । এরকমই এক ছেলে কলকাতার শুভ ।
একেবারে পশ্চিমে মহারাষ্ট্রের ১২ বছরের ছেলে কারন ঘুম থেকে ওঠে সূর্যের ঘুম ভাঙার আগেই । সে দিনে আট ঘন্টা, ইট ভাঙা এবং সিমেন্টের কাজ করে দিনে ৩০০ টাকার বেশি রোজগার করতে পারে না । তাঁর বাড়িতে ৫৬ বছর বয়সী 'মা' সান্তা কোভিডের কারনে কাজ হারায় । ফলে তাকে সংসারের সাহায্যের জন্য জোড় পূর্বক কাজে যেতে হয় । সে রোজ স্কুলে যেতে ভালোবাসত। কিন্তু কোভিডের কারনে তাঁর আর স্কুলে যাওয়া হয়না । সে ভূ-গোল নিয়ে পড়তে চায় , জানতে চায় সারা বিশ্ব কে , সে শিখতে চায় এই পৃথিবীকে । কারান বলে যখন আবার স্কুল চালু হবে তখোন স্কুলে যাবো পৃথিবীর যত কিছু অজানা জিনিস আছে সব জানবো । তার এই জানার ইচ্ছাই তাকে এক বৃহৎ মানুষে পরিনত করে তুলবে ।
বর্তমান সময়ে কোভিড প্যান্ডেমিকের কারনে বহু মানুষের চাকরি চলেগেছে অনেকে হারিয়েছে তাদের পিতা , মাতা , প্রিয় জনদের । আবার যাদের চাকরি আছে তাদের উপর মহল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কাল কোম্পানির লাভ না হলে , মাইনে না দেওয়ার কারনে চাকরি নাও থাকতে পারে । এই সময় দাঁড়িয়ে কিছু মধ্যবিত্ত ও গরীব ছেলে-মেয়েরা নতুন প্রযুক্তির সাথে তালমিলিয়ে ইন্টারনেট ব্যাবস্থার মাধ্যমে পড়াশোনা করার উপোযগী হয়ে উঠছে না, তাদের পরিবার থেকে স্মার্ট ফোন কিনে দেওয়ার সামর্থ নেই । এছাড়া বাবা - মায়ের চাকরি চলে যাওয়া এবং কোভিডের জন্য পরিবারের অর্থ উপার্জন কারির অকাল মৃত্যু হওয়ায় স্কুলের ফিস বা ইন্টারনেট সংযোগের যথাযথ ব্যবস্থা করে উঠতে পারছেনা । ডাইরেক্টর অফ চাইল্ড কেয়ার Kreeanne Rabadi একটি বিবৃতিতে বলেন যখন আবার স্কুল চালু হবে তখন প্রচুর সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী কে স্কুলে দেখা যাবে না , কারন তারা শ্রমে নিযুক্ত হয়ে গেছে ।
কলকাতা , মুম্বাই , চেন্নাই এই সকল মেট্রোপলিটন শহর গুলিতে - রেস্তোঁরা , সাফাই কর্মী , সবজি বিক্রেতা , ট্রেনে / বাসে হকার , চামড়ার কাজ , গার্মেন্টসের কাজ প্রভৃতি কাজ করে তাঁরা তাদের পরিবারে মুখে একটা হাঁসির রেষ নিয়ে আসত । আজ তারা এই মহামারীর কাছে হার মেনে নিয়েছে। কিন্তু তাদেত সন্তান - সন্ততিরা পরিবারের কথা ভেবে নিজের শিশু সুলভ মানসিকতাকে দূরে সরিয়ে রেখে , নিজের জীবন কে বাজি রেখে আজ তারা তাদের বাবা - মায়ের পরিচিত পেশায় নিযুক্ত হয়েছে । এর ফল স্বরূপ তারা শিক্ষা বিমুখ হয়ে শ্রম সম্মুখ হয়ে পড়ছে যথাযথ ভাবেই ।
মহামারীর কারনে সারা ভারতর্ষে বিদ্যালয় গুলি বন্ধ থাকে । প্রভাব স্বরূপ ২৮৬ লক্ষ্য শিশু (৪৮ শতাংশ বালিকা ) যারা প্রাথমিক এবং উচ্চ প্রাথমিক স্থর থেকেই বিদ্যালয় ছেড়ে দেয় । ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সাহা্য্যে মানিয়ে নিতে পারলেও বাকি ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে না পেরে তুলামূলক কম জ্ঞান অর্জন করছে ।
International child Labour Organisation (ILO) এবং UNICEF দুটি সংস্থার রিপোর্ট ২০২০ সালের অনু্যায়ী সারা বিশ্বে ১৬০ মিলিয়ন শিশু তার মধ্যে ৬৩ মিলিয়ন ছেলে এবং ৯৭ মিলিয়ন মেয়ে শ্রমের মাধ্যে নিযুক্ত আছে , যারা ইট, পাথর ভাঙা , সিমেন্টের কাজ প্রভৃতি করে থাকে । ১৬০ মিলিয়ন শিশুর মধ্যে রয়েছে যাদের বয়স ৫-১১ বছরের মধ্যে তাদের সংখ্যা ৮৯.৩ মিলিয়ন , ১২-১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩৫.৬ মিলিয়ন , ১৫-১৭ বছর বয়সী বয়স্কদের সংখ্যা ৩৫ মিলিয়ন ।
আমাদের দেশ ভারতর্ষে শিশু শ্রমের পরিসংখ্যান টা ক্রমশই উর্দ্ধমুখীতে থাকে । আফ্রিকাতে শিশু শ্রমের পরিসংখ্যান টা ২০২০ সালের গননা অনু্যায়ী ৭২ মিলিয়নে পৌঁচেছে আর এশিয়া মহাদেশে এই সংখ্যা টা দাঁড়িয়েছে ৬২ মিলিয়নের কাছাকাছি । শিশুদের কি দিয়ে যে কঠিন থেকে কঠিনতর কাজ গুলি করানোর ফলে সাময়ীক ভাবে তারা অর্থের বিনিময়ে হাঁসি খুশি থাকলেও , তাদের ভবিষ্যতে মানসিক বিক্রতী বা পঙ্গুত্বের সম্ভাবনা থেকে যায় । এই সব দিক গুলির কথা মাথায় রেখে International child Labour Organisation (ILO) এবং UNICEF নামক দূটি সংস্থা যৌথভাবে ১৯৯২ সালে শিশু শ্রমের জন্য প্রতিরোধ দিবস পালোনের সিদ্ধান্ত নেয় । সে অনুযায়ী ১২ ই জুন থেকে ILO বিভিন্ন কর্ম সূচির মাধ্যমে এই দিনটি কে পালোন করে থাকে । তাই প্রতিবছরের মত এবারের শিশুদের কে শ্রমের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদের সবার মন্ত্র হয়ে উঠুক " শিশু শ্রম শেষ হোক "।
#Endchildlabour2021

No comments:
Post a Comment